: প্রফেসর ড. মো: আবু তালেব, বাউবি।
শিক্ষা আজ আর কেবল চার দেয়ালের শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়; প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের কল্যাণে এটি পৌঁছে গেছে ঘরে ঘরে। এই পরিবর্তনের অগ্রভাগে রয়েছে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি)। সময়, স্থান ও বয়সের বাধা অতিক্রম করে সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার যে দৃষ্টান্ত বাউবি স্থাপন করেছে, তা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাতে ১৯৯২ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাউবির লক্ষ্য ছিল—যারা নানা কারণে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারেন না, তাদের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করা। কর্মজীবী মানুষ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, গৃহিণী, প্রবাসফেরত যুবক কিংবা ঝরে পড়া শিক্ষার্থী—সবাইকে শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগই বাউবির মূল শক্তি। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক দর্শনই প্রতিষ্ঠানটিকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
বাউবি উন্মুক্ত ও দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। মুদ্রিত পাঠ্যসামগ্রী, অডিও-ভিডিও লেকচার, অনলাইন ক্লাস এবং টিউটোরিয়াল সেশন—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীরা নিজস্ব সময় ও সুবিধামতো পড়াশোনা করতে পারেন, যা কর্মজীবী মানুষের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক।
দেশব্যাপী আঞ্চলিক কেন্দ্র ও স্টাডি সেন্টারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সরাসরি একাডেমিক সহায়তা ও পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পান। ফলে দূরশিক্ষা হলেও মানের প্রশ্নে আপস করা হয় না। বরং এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের আত্মনির্ভরশীল ও দায়িত্বশীল করে তোলে।
বাউবির একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো নারীদের শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা। অনেক নারী বিবাহ, পারিবারিক দায়িত্ব বা সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারেন না। বাউবি তাদের জন্য নতুন আশার দুয়ার খুলে দিয়েছে। ঘরে বসেই পড়াশোনা সম্পন্ন করে অনেক নারী আজ শিক্ষকতা, প্রশাসন কিংবা বিভিন্ন পেশায় সফলভাবে কাজ করছেন। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্টাডি সেন্টারে বিশেষ করে রংপুরে তৃতীয় লিঙ্গের বহু শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। তারা সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে বাউবি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করছেন। তাদের জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শতকরা ৬০ ভাগ কোর্স ফি মওকুফের ব্যবস্থা চালু আছে।
এছাড়া বাউবির বিভিন্ন ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট কোর্স দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে সহায়তা করছে। কৃষি, স্বাস্থ্য, ব্যবসায় প্রশাসন, শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি—এসব ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
ডিজিটাল যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাউবি তাদের কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে। অনলাইন ভর্তি, ফল প্রকাশ, ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ও ভার্চুয়াল ক্লাসরুম শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা গ্রহণকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করেছে। অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে একাডেমিক কার্যক্রম সচল রাখা বাউবির সক্ষমতারই প্রমাণ।
উন্মুক্ত শিক্ষার ক্ষেত্রে মাননিয়ন্ত্রণে বাউবি নিয়মিত পাঠ্যক্রম হালনাগাদ, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বজায় রাখছে। একইসাথে স্টাডি সেন্টারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, শিক্ষার্থী সহায়তা সেবার উন্নয়ন এবং গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে আজীবন শিক্ষার ধারণা ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে হলে নিয়মিত দক্ষতা অর্জন জরুরি। বাউবি এই চাহিদা পূরণে স্বল্পমেয়াদি ও পেশাভিত্তিক কোর্স চালুর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং অনলাইন কোর্স সম্প্রসারণের মাধ্যমে শিক্ষার গণতন্ত্রীকরণে বাউবির ভূমিকা আরও বিস্তৃত হবে- এ প্রত্যাশা আজ সকলের।
শিক্ষার নতুন দিগন্ত মানে কেবল প্রযুক্তির ব্যবহার নয়; বরং সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় সেই স্বপ্নই বাস্তবায়ন করছে। হাজারো মানুষের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণে বাউবি আজ এক নির্ভরতার নাম। মানোন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সম্প্রসারণ ও সামাজিক স্বীকৃতি নিশ্চিতের মাধ্যমে বাউবি শুধু দেশের নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উন্মুক্ত শিক্ষার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছে। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এই যাত্রায় বাউবি সত্যিই নতুন দিগন্তের পথিকৃৎ।
লেখক: অধ্যাপক ও গবেষক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। মোবাইল: ০১৭১৫-৪৭৯৬৬০
