• মায়ের কবরের পাশেই চির নিদ্রায় আইয়ুব বাচ্চু


    আইয়ুব বাচ্চু। ছবি: সংগৃহীত

    ডেস্ক নিউজ : কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুকে তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়েছে। শনিবার বিকেল তিনটার দিকে জানাজার উদ্দেশ্যে আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ চট্টগ্রাম নগরীর জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদ মাঠে নিয়ে আসা হয়। সেখানে হাজারও মুসল্লির অংশগ্রহণে তার চতুর্থ ও শেষ নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা পড়ান জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদের খতিব সৈয়দ আবু তালেব মোহাম্মদ আলাউদ্দিন। জানাজা শেষে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় নগরের বাইশমহল্লা চৈতন্যগলি কবরস্থানে। আর সেখানেই সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটার দিকে তাকে দাফন করা হয়।

    শনিবার সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে বেসরকারি একটি বিমানে আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে তা গ্রহণ করেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। এরপর মরহুমের কফিন নেওয়া হয় নগরের সদরঘাট থানার পূর্ব মাদারবাড়ি তার নানার বাড়িতে। এখানেই শৈশব কৈশোর কেটেছে এ শিল্পীর। নানার বাড়িতে কিছুক্ষণ রাখার পর শেষবারের মতো দেখতে আসা লোকজনের জন্য পূর্ব মাদারবাড়ির বালুর মাঠে রাখা হয় শিল্পীর মরদেহ।

    বৃহস্পতিবার (১৮ অক্টোবর) সকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি … রাজেউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর। আইয়ুব বাচ্চু স্ত্রী, রাজকন্যা নামের এক মেয়ে ও ছেলে আহনাব তাজওয়ারকে রেখে গেছেন। আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকে ছায়া নেমে আসে।

    জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকালে অসুস্থতার পর অচেতন হয়ে পড়লে তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সংগীতশিল্পী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, রাজনৈতিক দলের সদস্যসহ অগণিত মানুষ ছুটে যান হাসপাতালে।

    আমাদের দেশে ব্যান্ড সঙ্গীত তার গানেই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। শুধু বাংলাদেশে নয়, দেশের বাইরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ব্যান্ড সঙ্গীতের প্রসারেও আইয়ুব বাচ্চুর ছিল অসামান্য অবদান। তার জনপ্রিয় গানগুলির মাঝে ছিল : রূপালী গিটার, কেন এত অচেনা হলে, হাসতে দেখো গাইতে দেখো, কেউ সুখী নয়, ঘুম ভাঙা শহরে, দরোজার ওপাশে, ফেরারী, মেয়ে তুমি দুঃখ বুঝনা কেন, আমি কষ্ট পেতে ভালবাসি, আমিতো প্রেমে পড়িনি, বেলা শেষে ফিরে এসে, এক আকাশের তারা, অবাক হৃদয়, আমিও মানুষ, কষ্ট কাকে বলে, অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে। এমনি অসংখ্য কালজয়ী সব গানের সুরে কথায় নতুন প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

    শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ১২ পর্যন্ত শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে রাখা হয় আইয়ুব বাচ্চুর কফিন। সেখানে সর্বসাধারণ শ্রদ্ধা জানান। এরপর জুম্মার নামাজের সময় মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় জাতীয় ঈদগাহ মাঠে। সেখানে প্রথম জানাজা শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তার গানের স্টুডিও মগবাজারে ‘এবি কিচেনে’। সেখানে তার দ্বিতীয় জানাজা হয়। এরপর মরদেহ নেওয়া হয় তেজগাঁওয়ের চ্যানেল আই কার্যালয়ে। সেখানে তৃতীয় জানাজা হয়।

    আইয়ুব বাচ্চুর জন্ম ১৬ আগস্ট ১৯৬২ সালে। তার সঙ্গীত জীবনের শুরু ১৯৭৭ সালে। ১৯৭৮ সালে তিনি ব্যান্ড ফিলিংসে যোগ দেন। তার প্রথম গান ‘হারানো বিকেলের গল্প’। এরপর যোগ দেন সোলসে। ১৯৮০ থেকে পরবর্তী এক দশক এই ব্যান্ডে যুক্ত ছিলেন। সোলস ছাড়ার পর ১৯৯১ সালে নিজে সৃষ্টি করেন নতুন ব্যান্ড এলআরবি। প্রথমে এলআরবির পূর্ণ অর্থ ছিল লিটল রিভার ব্যান্ড। পরে এই নামে অস্ট্রেলিয়াতে আরেকটি ব্যান্ড থাকায় বদলে করা হয় লাভ রানস বøাইন্ড।

    আইয়ুব বাচ্চুর প্রথম একক অ্যালবাম প্রকাশ পায় ১৯৮৬ সালে ‘রক্তগোলাপ নামে’। আর এলআরবি’র প্রথম অ্যালবাম হলো এলআরবি (১৯৯২)। এরপর ব্যান্ডের সুখ (১৯৯৩),তবুও (১৯৯৪), ঘুমন্ত শহরে (১৯৯৫), ফেরারী মন (১৯৯৬), স্বপ্ন (১৯৯৬), আমাদের বিস্ময় (১৯৯৮), মন চাইলে মন পাবে (২০০০), অচেনা জীবন (২০০৩), মনে আছে নাকি নেই (২০০৫), স্পর্শ (২০০৮), যুদ্ধ (২০১২) প্রকাশ পায়।

    একক অ্যালবামের মধ্যে রক্তগোলাপের পর রয়েছে ময়না (১৯৮৮), কষ্ট (১৯৯৫), সময় (১৯৯৮), একা (১৯৯৯), প্রেম তুমি কি! (২০০২), দুটি মন (২০০২), কাফেলা (২০০২), প্রেম প্রেমের মতো (২০০৩), পথের গান (২০০৪), ভাটির টানে মাটির গানে (২০০৬), জীবন (২০০৬), সাউন্ড অব সাইলেন্স (ইন্সট্রুমেন্টাল ২০০৭), রিমঝিম বৃষ্টি (২০০৮), বলিনি কখনো (২০০৯) ও জীবনের গল্প (২০১৫)। এ ছাড়াও অনেক মিশ্র অ্যালবামে কাজ করেছেন তিনি। চলচ্চিত্রে ‘আম্মাজান’, ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’ গান দুটি তার গাওয়া জনপ্রিয় গান।

    Spread the love