• প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলে ব্যাংকের সুদ অবশ্যই মওকুফ করা হবে


    সাক্ষাৎকারে নজরুল ইসলাম মজুমদার

    মানিক মুনতাসির : বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলে ব্যাংক সুদ অবশ্যই মওকুফ করা হবে। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী-ঘোষিত প্রণোদনার টাকা ধাপ্পাবাজি করে নেওয়ার সুযোগ নেই।

    বিএবি চেয়ারম্যান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে এক সাক্ষাৎকারে বিশ্বব্যাপী চলমান কভিড-১৯-এর প্রভাবে বাংলাদেশে অচল হয়ে পড়া ব্যবসা-বাণিজ্য বাঁচাতে ব্যাংক খাতের ভূমিকা, ব্যাংক সুদ মওকুফ, প্রধানমন্ত্রী-ঘোষিত প্রণোদনার বাস্তবায়নসহ সামগ্রিক বিষয়ে তাঁর অভিমত তুলে ধরেন।

    বাংলাদেশ প্রতিদিন : চলমান লকডাউনের সময় ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যে ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে বিভিন্ন উদ্যোক্তা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?

    নজরুল ইসলাম মজুমদার : কভিড-১৯-কে কেন্দ্র করে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু ঋণের সুদ কী করে মাফ করা যায়! টাকা কার? টাকা তো জনগণের। বেশির ভাগ টাকাই তো জনগণের। স্পন্সর শেয়ারহোল্ডারদের ৩০-৪০ শতাংশ। বাকি ৬০-৭০ শতাংশ সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের। আর প্রায় ৮০ শতাংশ টাকাই তো জনগণের। তারা তো লাভের বিনিময়েই টাকা রেখেছেন, তাই না! আমরা যদি সুদ মাফ করে দিই তাহলে আমনাতের সুদ দেব কীভাবে? এরপর কর্মীদের বেতন। বাড়ি ভাড়া। অন্যান্য খরচ কীভাবে দেব? আমরাও তো ব্যবসা করি। এটা করলে ব্যাংক তো দেউলিয়া হয়ে যাবে। এ দাবিটা ন্যায়সম্মত নয়। আমি তো ব্যবসা করি। আমারও তো ১০-১২টি ব্যাংক থেকে লোন নিতে হয়েছে, তবে বিশেষ কোনো কেইসে এটা হতে পারে। যেমন কোনো লোক মারা গেছে, আগুন লেগে সব পুড়ে গেছে, কোনো দুর্যোগে সব নষ্ট হয়ে গেছে, তখন এটা হতে পারে। আমি তো ব্যবসায়ী আবার ব্যাংকের পরিচালক। আমরা কীভাবে করব? তবে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলে অবশ্যই আমরা তা করব। সরকার নিশ্চয়ই অন্য কিছু ভাবছে। সরকার হয়তো ভর্র্তুকি দেবে। তাহলে আমরা সুদ মওকুফ করে দিতে পারব। যেমন ব্রিটিশ সরকার বলছে তারা বেইলআউট করবে। এটাই একটা প্রক্রিয়া আছে। আরেকটা হতে পারে, যে পরিমাণ সুদ আমরা মাফ করব তা যদি সরকার আমাদের (ব্যাংকগুলোকে) প্রণোদনা হিসেবে দিয়ে দেয় তাহলে তা করা সম্ভব। এটা তো এত সহজে সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী হয়তো এমন কিছু একটা ভাবছেন। তিনি একজন বিচক্ষণ মানুষ। এত দিন ধরে দেশ চালাচ্ছেন। আমাদের যদি ভর্তুকি দেওয়াও হয় কত টাকা দেবে সরকার। এটা বিরাট অঙ্কের টাকা হবে। কেননা এখন তো সবই বন্ধ। শুধু খাবারের ব্যবসা ছাড়া কিছুই চলছে না। সেগুলোও ঠিকমতো চলছে না।

    বাংলাদেশ প্রতিদিন : যেসব শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে ঋণ পরিশোধ করেছে- এ মন্দা কাটিয়ে ওঠার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় নতুন ঋণ দেওয়ার দাবি উঠেছে। এ ব্যাপারে আপনারা কতটুকু প্রস্তুত?

    নজরুল ইসলাম মজুমদার : অবশ্যই তাদের ঋণ দিতে হবে এবং তারা অব্যাহতভাবে ঋণ পাবেন। যারা ভালো ব্যবসায়ী দেশে-বিদেশে যাদের সুুনাম আছে, তারা এখন কিস্তি দিতে পারছেন না। এটা স্বাভাবিক। তবে পরিস্থিতি স্বভাবিক হলে ব্যবসা-বাণিজ্য আবার ভালো হবে। নতুন ঋণ তো অবশ্যই দিতে হবে। ব্যাংক তো টাকার ব্যবসা করে তাই না! যারা ভালো ব্যবসায়ী, তারা এখন সমস্যায় আছেন। পরিস্থিতি ভালো হলে তাদের অবস্থাও সামনে ভালো হবে। তাদের আমরা ঋণ দিয়েই যাব। এতে কোনো সমস্যা হবে না।

    বাংলাদেশ প্রতিদিন : ঋণের কিস্তি জুন পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। জুন পর্যন্ত যেন কেউ নতুন করে খেলাপি না হয় সেটা বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা এটাকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। আপনি কী মনে করেন এ বিষয়ে? জুনের মধ্যে এ মহামারী থেমে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

    নজরুল ইসলাম মজুমদার : সেটা খুই যৌক্তিক দাবি। ন্যায়সংগত এবং সময়োপযোগী। কেননা এই করোনাভাইরাস জুনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নাই। দিন দিন রোগী বাড়ছেই আমাদের। মারাও যাচ্ছে। দেখুন চীনে, ইতালিতে আমেরিকায় কোথাও তো থামছে না। অথচ সেখানে অনেক আগেই শুরু হেেয়ছে। ফলে আমরা অর্থমন্ত্রীকে বলেছি ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়াতে হবে খেলাপি ঋণের বিষয়টা। এখন তো কোনো ব্যবসায়ীই টাকা দিতে পারছেন না। তারা ডিসেম্বরে গিয়েও টাকা দিতে পারবেন কিনা নিশ্চয়তা নেই। ফলে এটা ডিসেম্বর পর্যন্ত হতে হবে। এটা না হলে এতে ব্যাংকের ব্যালান্স শিট নেগেটিভ হয়ে যাবে। এতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাবে। এজন্য এটা ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে তখন তো ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হয়ে যাবে। এতে দেশের অর্থনীতির রেটিং কমে যাবে। তখন বিদেশি ব্যাংকগুলো বলবে তোমাদের ব্যবসায়িক এলসি খোলা যাবে না। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ নানা কথা বলবে। বলবে তোমাদের তো অবস্থা খারাপ। এটা করতেই হবে।

    বাংলাদেশ প্রতিদিন : শিল্পকারখানার উৎপাদন অব্যাহত রাখতে এবং ব্যবসায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন তা দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। এ প্যাকেজ কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে বলে আপনি মনে করেন?

    নজরুল ইসলাম মজুমদার : এটা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। আমি আগেই বলেছি প্রধানমন্ত্রী একজন অত্যন্ত বিচক্ষণ মানুষ। টাকাটা কীভাবে বিতরণ হবে তাও তিনি বলে দিয়েছেন। এটা দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সুন্দরভাবে বলে দিয়েছেন বিকাশ কিংবা রকেট বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শ্রমিকের কাছে চলে যাবে বেতনের টাকা। এটা শ্রমিকরাই পাবে। মালিকদের নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমি মনে করি এটা অত্যন্ত ভালো পদ্ধতি। যদি কারও (কোনো ব্যবসায়ীর) কোনো উদ্দেশ্য থাকে টাকা নেওয়ার তাও পারবে না। এটা সরাসরি শ্রমিকদের কাছেই চলে যাবে। আর বাকিটা তো ব্যাংক দেখেশুনেই দেবে। খেলাপিদের কেউই দেবে না।

    বাংলাদেশ প্রতিদিন : ইতিপূর্বে যারা ব্যাংক লোন নিয়ে খেলাপের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছেন জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে তাদের চিরদিনের জন্য ব্যাংক লোন বন্ধ করার দাবি উঠেছে।

    নজরুল ইসলাম মজুমদার : যারা টাকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ফেরত দিচ্ছেন না তাদের অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি করা হচ্ছে বলে অর্থমন্ত্রী আমাদের জানিয়েছেন। তারা তো ঋণ পাবেনই না। বরং তাদের যে সম্পদ আছে তা বিক্রি করে টাকা তোলা হবে। আমি চাই ঋণখেলাপিদের কঠোর শাস্তি হোক। খেলাপিরা কোনোভাবেই এ সুবিধা পাবেন না। যারা টাকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ফেরত দিচ্ছেন না তাদের ফাঁসি দিলেও তো টাকা আসবে না। কিন্তু শাস্তির একটা ব্যবস্থা তো থাকতে হবে। তাকে নতুন করে ঋণ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। দেউলিয়া আইন পাস করে ওই লোককে দেউলিয়া ঘোষণা করা উচিত। এ ব্যাপারে আমরা সতর্ক থাকব অবশ্যই। যাদের সিআইবি রিপোর্ট খারাপ তারা কোনোভঅবেই টাকা পাবে না। তাদের টাকা দিতে কোনো এমডিই সাহস করবে না। কার এত সাহস আছে যে খেলাপিদের আবার নতুন করে টাকা দেবে।

    বাংলাদেশ প্রতিদিন : এই মহামারীর ক্ষতি মোকাবিলায় ব্যাংকগুলো নিজেরা বিশেষ উদ্যোগ বা ঋণসেবা চালু করতে পারে কিনা, যা অর্থনীতিতে গতি ফেরাবে।

    নজরুল ইসলাম মজুমদার : এই মহামরী মোকাবিলার জন্য পৃথক কোনো স্কিম চালুর প্রশ্নই আসে না। বেসরকারি ব্যাংক নতুন করে কী স্কিম চালু করবে! এটা হয় না। তবে আমরা ভালো ব্যবসায়ীদের টাকা দিয়েই যাব। যারা ভালো ব্যবসায়ী তারা সব সময়ই ঋণ পাবেন। এটা তো অটোমেটিক্যালিই হবে। তবে দুর্যোগকালে আমরা সরকারকে সিএসআরের মাধ্যমে কিছু হেল্প করতে পারি। এটা আমরা সব সময় করি। এবারও দিয়েছি। দরিদ্র মানুষের জন্য দিচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী দিচ্ছেন। আমরা তো দেখছি। সেটা তো আমরা করছিই।

    বাংলাদেশ প্রতিদিন : শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের পাশাপাশি বিএবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমাতে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে পারে কিনা?

    নজরুল ইসলাম মজুমদার : খেলাপি ঋণ কমানো নির্ভর করে ব্যবসার ওপর। ব্যবসা চালু হলে এটা কমে যাবে। কোনো ব্যবসায়ী খেলাপি হয়ে গেছে, তার ব্যবসা ভালো হলে আবার সে নিয়মিত হতে পারবে। মনে করেন কারও সামান্য কিছু লোন পরিশোধ বাকি থাকতে খেলাপি হয়ে গেছে তখন সেটা যাচাই-বাছাই করে আমরা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করি। এদের সহযোগিতা দিতে হবে।

    বাংলাদেশ প্রতিদিন : ঘোষিত প্রণোদনা যাতে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা পায় সেজন্য আর কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়?

    নজরুল ইসলাম মজুমদার : এখানে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরাই এ সুবিধা পাবেন। এখানে ধাপ্পাবাজির কোনো সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী নিজেই এটা নজরদারি করছেন। ফলে এখানে কোনোরকম দুর্নীতি বা অনিয়ম হওয়ার সুযোগ আমি অন্তত দেখি না।

    বাংলাদেশ প্রতিদিন : আপনি কি মনে করেন রাজনৈতিক চাপমুক্ত থেকে প্রণোদনা বিতরণ করা যাবে?

    নজরুল ইসলাম মজুমদার : আমি নিজে রাজনীতি করি না। এটা আমি বলাটা ঠিক হবে না। তবে এটা এই মুহূর্তে রাজনৈতিকভাবে দেখলে হবে না। কে কোন দলের তা বিচার করে লোন দেওয়া হয় না। এটা একটা সর্বদলীয় প্রণোদনাা সেটা তো অবশ্যই ঠিকমতো হবে। এখানে রাজনৈতিক চাপ তো কোনোভাবেই আসবে না। কারণ এটা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিজেই দেখভাল করছেন। আর তিনি তো জনগণের অভিভাবক। সবার কথাই তো তাকে ভাবতে হয়। তিনি তো সবার কথাই বলবেন। এটা স্বাভাবিক।

    বাংলাদেশ প্রতিদিন : বাংলাদেশ প্রতিদিন পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।

    নজরুল ইসলাম মজুমদার : আপনাকেও ধন্যবাদ।

    সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন।

    Spread the love