• পাট নিয়ে স্বপ্ন : বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ


    ড. মো. আব্দুল ওহাব : রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলা স্বপ্নের বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা স্বপ্নের বাস্তবায়নের আর একটি স্বপ্ন দেখছি আমরা। জাতির পিতার সুযোগ্য উত্তরসুরী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বকবি ও জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়ায় প্রত্যয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশ বিদেশে পাট পণ্যের বহুবিধ ব্যবহারের মাধ্যমে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন নিয়েই এ লেখা।

    পাট এক সময় বাংলাদেশে সোনালী আঁশ হিসেবে পরিচিত ছিল। স্বচ্ছ পানিতে ধোয়া পাটের আঁশ দুপুরের রোদে ভাদ্র মাসে হাসির ঝলক দিত বলেই পাটকে বলা হতো সোনালী আঁশ। এখন আর সেই স্বচ্ছ পানিও নেই, পাটের আঁশে সূর্যের রোদের হাসিও নেই। বাজারে প্রথম পাট বেচা টাকার জিলাপী/রসগোল্লা আর ইলিশ মাছ নিয়ে কৃষক যখন ঘাটে নৌকা ভিড়াতো, তখন ছেলে-মেয়ে আর কৃষাণীর মুখের আনন্দের হাসিতে সবার প্রাণ জুড়িয়ে যেত। বর্ষায় এখন আর মাঠ ভরা পানিও নেই, কৃষকের ঘাটে নৌকাও নেই। ভাদ্র মাসে পাট বেচা টাকার হাসির আনন্দ আজ কৃষকের মুখ থেকে ম্লান হয়ে গেছে। কারণ, তখন পাট ছিল বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান পণ্য। স্বাধীনতার পরও প্রায় দেড় যুগ ধরে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাটের ভূমিকা ছিল মুখ্য। পাট উৎপাদনে বিশ্বে ভারতের অবস্থান শীর্ষে এবং বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় হলেও বাংলাদেশ পাট রপ্তানিতে বিশ্বে প্রথম। অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের পাটের মানও ভাল। বাংলাদেশে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয় এবং উৎপাদন হয় ৭৪.৪০ লাখ টন। দেশের প্রায় ৫০ লাখ কৃষক পাট চাষের সাথে জড়িত। দেশে মোট রপ্তানি আয়ের শতকরা ৩-৪ ভাগ আসে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে। বাংলাদেশ বিশ্বের মোট পাটের ৩৩ শতাংশ উৎপাদন করে এবং কাঁচা পাটের ৯০ শতাংশ রপ্তানি করে।

    পাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান। তৈরি পোশাক শিল্পের পরই পাট দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। দেশের কৃষকদের নগদ অর্থের জোগান দেয় পাট। পাটের বিক্রিত অর্থ সংসারের বিবিধ খরচ যেমন ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া, কাপড়-চোপড়ের মত নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যয়, রবি ফসল আবাদের জন্য অর্থের জোগান, একটুখানি সংগতি হলে জমি ক্রয় বা ঘর-বাড়ি তৈরি করে ভালভাবে জীবন যাপন করতে পারে। কৃষকের জীবন জীবিকা ছাড়াও পাট মাটির ঊর্বরতা বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই জমিতে সবসময় ধান বা একই ফসল চাষ করার ফলে মাটির উপরিভাগের (Top Soil) খাদ্য উপাদানের ঘাটতি দেখা দেয়। পাট চাষের ফলে পাটের পাতা পচে জমিতে প্রচুর পরিমাণ জৈব সার সরবরাহ করে। পাটের শিকড় মাটির গভীর থেকে গাছের খাদ্য উপাদান উপরিভাগে নিয়ে আসে। ফলে জমির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে বলে জমিতে পরবর্তী ফসল ভাল হয়। কৃষক ফসল ধারায় বা শস্য বিন্যাসে পাটকে সম্পৃক্ত করে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, পাট ফসল উৎপাদনকালে হেক্টরপ্রতি ৫ থেকে ৬ টন পাতা মাটিতে পড়ে পচে জৈব সারে পরিণত হয়। এছাড়া পাট ফসল কর্তনের পর জমিতে যে পাট গাছের গোড়াসহ শিকড় থেকে যায় তা পরে পচে মাটির সঙ্গে মিশে জৈব সার যোগ করে। এতে পরবর্তী ফসল উৎপাদনের সময় সারের খরচ কম লাগে। প্রতি বছর গড়ে ৯৫৬.৩৮ হাজার টন পাট পাতা ও ৪২৩.৪০ হাজার টন পাট গাছের শিকড় মাটির সঙ্গে মিশে যায় যা মাটির ঊর্বরতা ও গুণগতমান বৃদ্ধিতে ব্যাপক প্রভাব রাখে। এ কারণে যে জমিতে পাট চাষ করা হয়, সেখানে অন্যান্য ফসলের ফলনও ভালো হয়। পাট চাষের ফলে পাতার মাধ্যমে গৃহীত কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও অক্সিজেন নির্গমনের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণমুক্ত করে। প্রতি হেক্টর পাট ফসল ১০০ দিন সময়ে ১০.৬৬ টন অক্সিজেন সরবরাহ করে বায়ুমÐলকে বিশুদ্ধ ও অক্সিজেন সমৃদ্ধ রাখে। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু পাট চাষের অনুকূল হওয়ায় পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নতমানের পাট উৎপন্ন হয় বাংলাদেশে।

    পাট এমনই একটি ফসল যার কোন কিছুই ফেলানোর নয়। পাটের আঁশ থেকে তৈরি হয় বহুবিধ পণ্য, পাতা থেকে তৈরি হয় চা, পাটকাঠি জ্বালানী ও চারকোল তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। পাটের আঁশ থেকে তৈরি করা হয় ভিসকস সুতা। ভিসকস সুতার তৈরি পোশাক অনেক আরামদায়ক এবং দামও বেশি। দেশে প্রতি বছর বস্ত্র কারখানাগুলোতে ৭০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকার মূল্যের ৩০-৩৫ হাজার টন ভিসকস সুতা আমদানি করা হয়। দেশের গবেষকগণ পাট থেকে সোনালী ব্যাগ তৈরির যে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, তা কাজে লাগাতে হবে। দেশে বিদেশে প্রচুর পরিমাণ পরিবেশবান্ধব সোনালী ব্যাগের চাহিদা রয়েছে। বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৫০০ মিলিয়ন শপিং ব্যাগের চাহিদা আছে। এই চাহিদার একটি ক্ষুদ্র অংশও বাংলাদেশের উদ্ভাবিত সোনালী ব্যাগ দ্বারা পূরণ করা হলে, পাট খাতে এক নীরব বিপ্লব সাধিত হবে। বিদেশ ছাড়াও দেশে সোনালী ব্যাগের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। প্রতি দিন দেশে ৫০০ টন সোনালী ব্যাগ তৈরী হলেও তা বাজারজাতকরণে অসুবিধা হবে না।

    বিশ্বে প্রতি মিনিটে ১০ লাখের বেশি এবং বছরে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন টন পলিথিন ব্যবহার করা হয় এবং এর ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার মানুষ ছাড়াও বিপুল সংখ্যক স্থল ও জলজ প্রাণী। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে শুধু ঢাকাতেই প্রতিমাসে প্রায় ৪১ কোটি পলিব্যাগ ব্যবহার করা হয়। পলিব্যাগ তৈরিতে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে মোট খনিজ তেলের ৪ শতাংশ ব্যবহৃত হয়। পাট সুতার পণ্য/ব্যাগ পচনশীল। পোড়ানোর দরকার হয় না। আর পোড়ালেও এক টন পাট থেকে ২ গিগা জুল তাপ এবং ১৫০ কিলোগ্রাম কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাতাসে ছড়ায়। অন্যদিকে ১ টন প্লাস্টিক ব্যাগ পোড়ালে ৬৩ গিগা জুল তাপ এবং ১,৩৪০ কিলোগ্রাম কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিবেশ দূষণ করে। এসব বিষয় বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা খাদ্য শস্য ও চিনি মোড়কীকরণের জন্য পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যাগ বা থলে ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পলিব্যাগের ক্ষতিকর বিষয় বিবেচনা করে প্রাকৃতিক তন্তু ব্যবহারে ঝুকে পড়েছে। এক্ষেত্রে পাটের ব্যাগ বা পণ্য হতে পারে বিকল্প।

    পাটের আশ থেকে তৈরি হচ্ছে শাড়ি, লুঙ্গি, সালোয়ার, কামিজ, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, ব্যাগ, খেলনা, শো-পিস, ওয়ালমেট, আল্পনা, দৃশ্যাবলী, নকশিকাঁথা, পাপোশ, জুতা, স্যান্ডেল, শিকা, দরি, সুতলি, পর্দার কাপড়, গহনা ও অলংকার সহ ২৮৫ ধরনের পণ্য যা দেশে ও বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। পাটকে বিশ্ববাজারে তুলে ধরতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘জুট ডাহভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি)’ ১৩৫ প্রকার বহুমুখী পাট পণ্যের স্থায়ী প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্র চালু করেছে। পলিথিন পণ্য বা পলিব্যাগ কোনভাবেই পচে মাটিতে মিশে যায় না। এছাড়া নদী, নালা, ডোবা যেখানেই পলিব্যাগ ফেলা হোক না কেন বৃষ্টি বা যে কোন ভাবে জমা পানি মাটির নিচে লিচিং বা প্রবেশ করতে বাধা দেয়। ফলে মাটির নীচে পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে, মাটির নিচ থেকে পাম্প করে উপরে পানি উঠানো খুব কষ্টকর হয়। শুকনা মৌসুমে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে থাকায় কৃষি ক্ষেতে পানি সেচের অভাব প্রকট হচ্ছে।

    পাট চাষে এক দিকে সোনালী আঁশ, অন্য দিকে রূপালী কাঠি দুইয়ে মিলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে প্রেক্ষাপট। পাটকাঠি এতদিন গ্রামে রান্নার কাজে জ্বালানি ও ঘরে বেড়া দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হতো। এখন পাটকাঠি থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হচ্ছে উচ্চমূল্যের অ্যাক্টিভেটেড চারকোল বা ছাই। এই ছাই বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে যা থেকে তৈরি হচ্ছে কার্বন পেপার, কম্পিউটার ও ফটোকপির কালি, মোবাইল ফোনের ব্যাটারি, ওয়াটার পিওরিফিকেশন প্লান্ট, বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনী পণ্য। পাটের ছাই রপ্তানি হচ্ছে চীন, তাউওয়ান, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশে। ছাইয়ের বড় বাজার রয়েছে মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানীসহ ইউরোপীয় দেশগুলো। বিশেষ চুল্লির মাধ্যমে পাটকাঠি পুড়িয়ে ছাই করা হয়। দেশে প্রথম পাটকাঠির ছাই উৎপাদনের কারখানা তৈরি করেন চীনা নাগবিক ওয়াং ফেই। ২০১১ সালে যৌথভাবে কারখানায় নিবন্ধন নেন এবং ২০১২ সালে প্রথমে জামালপুরে এবং পরে খুলনা ও ফরিদপুর কারখানা চালু হয়। এ ধরনের কারখানায় বিদ্যুতের তেমন প্রয়োজন হয় না এবং কারখানায় বিনিয়োগেও বেশি অর্থের দরকার হয় না। কাঁচা পাটখড়িও খুব সহজে কমদামে পাওয়া যায়। পাটখড়ির ছাই তৈরি করা খুব সহজ ও রপ্তানির বাজার থাকায় খুব অল্প সময়েই ২৫টিরও বেশি কারখানা পাট চাষের এলাকায় গড়ে ওঠে। পাট অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দেশে বছরে প্রায় ৩০ লক্ষ টন পাটখড়ি উৎপাদিত হয়। এর মাত্র অর্ধেকও যদি ছাই করা যায় তা হলে ২ লক্ষ ৫০ হাজার টন ছাই পাওয়া সম্ভব যার বাজার মূল্য ২,৫৫০ কোটি টাকা। এছাড়া প্রত্যক্ষভাবে ২০ হাজার ও পরোক্ষভাবে ২০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে। শুধুমাত্র চীনেই প্রায় ৩ হাজার কারখানা রয়েছে যেখানে পাটকাঠির ছাই ব্যবহার করে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা হয় এবং এগুলোর একটি ছোট কারখানাতেও প্রতিমাসে প্রায় ১০০ টন ছাই প্রয়োজন হয়।

    বাংলাদেশের পাট শুধু সোনালী আঁশ হিসেবেই পরিচিত নয়। পাট গাছের প্রতিটি অংগই মানুষের জন্য প্রয়োজন। পাটের পাতা তৈরি করেছে এক নতুন সম্ভাবনা। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে পাট পাতা থেকে চা অর্থাৎ এক ধরনের পানীয় তৈরি করেছেন। অর্গানিক সার ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদিত গাছের পাতা বিশেষ প্রক্রিয়ায় পাতার সকল গুণাগুণ ঠিক রেখে তৈরি করা হয় মিরাকল অর্গানিক গ্রীন টি। ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, হৃদরোগ, আলছার, লিভারের ক্ষয় রোধ, রক্তচাপ ও কোলেস্টরেল নিয়ন্ত্রণ করার মতো অলৌকিক গুণাবলী রয়েছে, পাট পাতার তৈরি চায়ে। অলৌকিক গুণাবলীর কারণেই এ চায়ের নামকরণ করা হযেছে মিরাকল অর্গানিক গ্রিন টি। এ গ্রিন টিতে যে পরিমাণ অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, ভিটামিন এ, সি, ই ও অন্যান্য ভিটামিন, মিনারেল ও ফাইটোক্যামিক্যাল আছে, তা অনেক দামি ফল-মূল শাক-সবজিতেও পাওয়া যায় না। স্বাদে গ্রিন টি অন্য সাধারণ চায়ের মতো এবং দামও একই।

    ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট এ গ্রিন টি আবিষ্কারের পর ঢাকার গুয়ার্চি অ্যাকুয়া অ্যাগ্রো টেক নামক একটি প্রতিষ্ঠান পাটের পাতা থেকে তৈরি অর্গানিক গ্রিন টি এর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পর জার্মানীতে রপ্তানি শুরু করে। এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ইসমাইল হোসেন খান। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি সরকারী ব্যবস্থাপনায় চলে গেছে। ইসমাইল হোসেন খানকে করা হয়েছে পাট পাতা থেকে চা তৈরি প্রকল্পের উপদেষ্টা। জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে ১ কোটি ১৬ লক্ষ টাকা ব্যয়ে একটি কারখানা নির্মাণ করা হয়েছে। কারখানা থেকে উৎপাদিত চা দেশে বিদেশে ব্যবহার হবে। পাট ও চা শিল্প সমৃদ্ধ হবে। পাটের সোনালী দিন ফিরিয়ে আনতে পাটকে নানাভাবে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে।

    পাট পাতার বহুবিধ ব্যবহার এখানেই শেষ নয়। পাট পাতা শাক হিসেবে বাংলাদেশের অনেক এলাকায় প্রিয় খাদ্য এবং বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়। পাটের পাতায় রয়েছে অনেক জানা অজানা পুষ্টি ও ঔষধি গুণ। বর্তমানে পাট শাক সারা বছরই বাজারে পাওয়া যায়। পাট শাক যেমন মুখরোচক তেমনি স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিয়মিত পাট পাতা খেলে হৃৎপিন্ডের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে, হজম শক্তি বাড়ায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, শক্ত হাড় গঠন করে, রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে, অনুভূতি শক্তি বাড়ায়, ঘুমের অভ্যাস স্বাভাবিক করে, শরীর বৃদ্ধি ও গঠনে ভারসাম্য রক্ষা করে, রক্ত সঞ্চালন নিয়ন্ত্রণ করে, শক্তি সঞ্চালন বৃদ্ধি করে, প্রদাহ ও জ্বালা বাড়ায়, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। পাট শাকের বহুবিধ গুণ থাকায় অতি প্রাচীন কাল থেকেই সবজি হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। আর তাই জাপানীদের কাছে গাঢ় সবুজ রং এর শুকনা পাট পাতা খুবই পছন্দনীয়। প্রতি বৎসর প্রচুর পরিমাণ পাট পাতা বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকে। ভবিষ্যতে দেশের পুষ্টিমান নিরসনে পাট শাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

    উপরোক্ত আলোচনা থেকে জানা যায়, পাট চাষের মাধ্যমে পাট থেকে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য দেশে ও বিদেশে বাজারজাত করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। পাট থেকে উৎপাদিত বিভিন্ন প্রকার আকর্ষণীয় পণ্য বহির্বিশ্বে বাজারজাতকরণের জন্য বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে তৎপর হতে হবে। সরকারি, বেসরকারি পর্যায়ে পাট পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পাট শিল্পের উপর বিশেষজ্ঞ তৈরি করা হয়। পাট শিল্পের উন্নয়নে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়েগুলোতেও অনুরূপ বিশেষজ্ঞ তৈরি করা প্রয়োজন। দেশের কৃষকদের নগদ অর্থ উপার্জন, কর্মসংস্থান, দারিদ্র বিমোচন, বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ ও জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তভাবে সংগঠিত করতে পাট গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বর্তমান বিশ্ববাজারে পাট ও পাট পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে পাটের উৎপাদন বৃদ্ধির যে অমিত সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তাকে কাজে লাগাতে হবে সুষ্ঠ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে। পাট ভিত্তিক সকল পণ্যের পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে হবে। সে জন্য প্রয়োজন সরকারের পৃষ্ঠপোশকতা। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে ঐতিহ্যবাহী পাটের ক্ষেত্রে সে পৃষ্ঠপোশকতা দিতে বর্তমান কৃষকবান্ধব সরকার সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলেই আমাদের সকলের ধারণা। সোনালী আঁশ ও পাট পণ্যের বহুবিধ ব্যবহারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হবে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন।

    লেখক : ড. মো. আব্দুল ওহাব
    সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং কৃষি প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ
    ই-মেইল: m.wohab@yahoo.com

    Spread the love